মায়ের মৃত্যুর ঘটনায় যুগ্ম সচিব ছেলে প্রত্যাহার: অবহেলার সুষ্ঠু তদন্ত ও মানবাধিকার রক্ষায় সোচ্চার আইনজীবীরা


রাজধানীর মিরপুরে নিজ বাসায় এক ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা মায়ের করুণ মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর ছেলে যুগ্ম সচিব আনিসুর রহমানকে মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য পদ থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। বুধবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে তাঁকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে মন্ত্রণালয় ওএসডি (অনুমুক্ত কর্মকর্তা হিসেবে সংযুক্ত) করেছে।

এর আগে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আব্দুল বারী জানান, 'পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩' অনুযায়ী অভিযুক্ত সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট যুগ্ম সচিব এ কে এম আনিসুর রহমানের বক্তব্য গ্রহণসহ সমস্ত প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন

গত রোববার জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর '৯৯৯' (Triple Nine)-এ একটি কল পেয়ে রাজধানীর মিরপুর ১১ নম্বরের একটি ফ্ল্যাট থেকে ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা নূরজাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ

গণমাধ্যমে প্রকাশিত বাসার ভেতরের সচিত্র প্রতিবেদনটি জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও রক্তক্ষরণের সৃষ্টি করেছে। মানবাধিকারকর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট রওশন আলী ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বাসার রান্নাঘর, ওয়াশরুম থেকে শুরু করে বেডরুমের যে চিত্র সামনে এসেছে, তা অত্যন্ত অস্বাভাবিক। ঘরটির যে জরাজীর্ণ ও নোংরা পরিস্থিতি দেখা গেছে, তা একদিনে তৈরি হওয়া সম্ভব নয়; বরং মাসের পর মাস ধরে এমন চরম অবহেলা ও করুণ পরিবেশে বৃদ্ধা সেখানে অবস্থান করছিলেন

পরিবারের সদস্যরা সমাজে অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ায় পুরো তদন্ত প্রক্রিয়া যেন কোনোভাবে প্রভাবিত না হয়, সেজন্য একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। ইতিমধ্যেই এই ঘটনায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে এবং সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করার জন্য সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেছেন। বর্তমানে পুলিশি প্রক্রিয়ায় একটি অপমৃত্যুর (UD) মামলা দায়ের করা হয়েছে

আইনজীবীদের মতে, বাংলাদেশে ২০১৩ সাল থেকে 'পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন' কার্যকর রয়েছে। সন্তান সচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও যদি পিতা-মাতার খোঁজখবর ও ভরণপোষণ না নেন, তবে আদালত চাইলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও নির্দিষ্ট পরিমাণ আর্থিক সহায়তার আদেশ দিতে পারেন। তবে সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার অভাবের কারণে অনেক সময় নিরুপায় বাবা-মায়েরা আদালতের দ্বারস্থ হতে চান না

এই ট্র্যাজেডির পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জবাবদিহিতার দিকেও আঙুল তুলেছেন। দেশে ৬০ বা ৭০ ঊর্ধ্ব প্রবীণ নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নিঃসঙ্গতা ও অবহেলার হাত থেকে তাঁদের রক্ষা করতে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা ও ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের মতো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোরালো তাগিদ দেওয়া হয়েছে

Post a Comment

0 Comments