পারস্য উপসাগরে ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এখন কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি বিশ্ব রাজনীতির এক জটিল মঞ্চে পরিণত হয়েছে। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়ে নেটোর (NATO) ওপর দায় চাপাচ্ছেন, অন্যদিকে ইউরোপীয় মিত্ররা সরাসরি আঙুল তুলছেন ট্রাম্পের ‘ভুল সিদ্ধান্তের’ দিকে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারা নেটোর ভবিষ্যতের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে। তবে ট্রাম্পের এই যুক্তি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন ব্রিটিশ ডিফেন্স স্টাফের প্রাক্তন প্রধান জেনারেল স্যার নিক কার্টার। তার মতে, নেটো কোনো একক নেতার পছন্দের যুদ্ধে ‘বলির পাঁঠা’ হওয়ার জন্য গঠিত হয়নি।
জার্মানির পক্ষ থেকেও এসেছে কঠোর প্রতিক্রিয়া। দেশটির সরকারের মুখপাত্র সাফ জানিয়েছেন, ইরানের সাথে এই সংঘাতের সাথে নেটোর কোনো সম্পর্ক নেই। এমনকি জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস ট্রাম্পকে বিদ্রুপ করে প্রশ্ন তুলেছেন যে, আমেরিকার শক্তিশালী নৌবাহিনী যা পারছে না, ইউরোপের কয়েকটি জাহাজ তা কীভাবে করবে?
বিশ্বের ‘তেলের ধমনী’ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালী এখন কার্যত ইরানের নিয়ন্ত্রণে। ভারত ও চীনের মতো হাতেগোনা কয়েকটি মিত্র দেশের জাহাজ ছাড়া বাকি সব তেলবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে তেহরান। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের তীব্র হাহাকার শুরু হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
এক সময়ের সমুদ্রজয়ী ব্রিটেনের অবস্থা এখন বেশ নাজুক। পারস্য উপসাগরে মাইন পরিষ্কার করার জন্য ব্রিটেনের কোনো সক্রিয় জাহাজ (মাইন সুইপার) নেই। তাদের প্রধান জাহাজটি বর্তমানে মেরামতের জন্য পড়ে আছে। সরাসরি জাহাজ পাঠাতে ব্যর্থ হয়ে রয়্যাল নেভি এখন নতুন প্রযুক্তির ড্রোনের ওপর ভরসা করছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুদ্ধের ময়দানে এই ড্রোনের কার্যকারিতা এখনো পরীক্ষিত নয়।
কূটনৈতিক মহলে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। কয়েক মাস আগে গ্রিনল্যান্ড কেনার অবাস্তব দাবি তোলা থেকে শুরু করে বর্তমানে মিত্রদের সংহতির সবক দেওয়া—সব মিলিয়ে আটলান্টিকের দুই পাড়ের দেশগুলোর মধ্যে অবিশ্বাসের দেয়াল আরও উঁচু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ১৯শে জুন ১৯৯১ সালের কুয়েত উপকূলের মাইন সরাতে পশ্চিমা দেশগুলোর ৫১ দিন লেগেছিল, অথচ বর্তমানের পরিস্থিতি আরও অনেক বেশি জটিল।
সামগ্রিকভাবে, পারস্য উপসাগরের এই সংকটের কোনো সহজ বা দ্রুত সমাধান দেখা যাচ্ছে না। ট্রাম্পের একতরফা সিদ্ধান্তের মাসুল এখন পুরো বিশ্বকে গুনতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
0 Comments