ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ: আরব দেশগুলোর রহস্যময় নীরবতা ও নেপথ্যের কারণ


মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে ইরান এখন এক চরম সংকটের মুখোমুখি। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযানে দেশটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক—সবাই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। তবে এই কঠিন সময়ে প্রতিবেশী মুসলিম আরব দেশগুলোর ভূমিকা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন।
ইসরাইলি হামলায় ইতোমধ্যেই ইরানের শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামিনী এবং আলী লারিজানি নিহত হয়েছেন। নিহতের সংখ্যা ২,০০০ ছাড়িয়েছে এবং প্রতিদিন ধ্বংস হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যেন ইরানকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার মিশনে নেমেছে।
ইরানের ওপর যখন এই ভয়াবহ আগ্রাসন চলছে, তখন অনেক আরব দেশের আকাশপথ ও জলসীমা ব্যবহৃত হচ্ছে হামলার কাজে। প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানালেও কোনো মুসলিম দেশই যুক্তরাষ্ট্রকে কার্যকরভাবে বাধা দিচ্ছে না। বিশ্লেষকরা একে 'ক্যালকুলেটেড নিউট্রালিটি' বা হিসেব কষে নিরপেক্ষ থাকা বলে অভিহিত করছেন।

আরব বিশ্বের অনীহার নেপথ্যে মূল কারণসমূহ:
১. আঞ্চলিক ক্ষমতার লড়াই: সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত মনে করে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের (শিয়া রাষ্ট্র) প্রভাব বৃদ্ধি তাদের সুন্নি নেতৃত্বের জন্য সরাসরি চ্যালেঞ্জ। ফলে ধর্মীয় ঐক্যের চেয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থই এখানে প্রাধান্য পাচ্ছে।
২. গোপন আঁতাতের গুঞ্জন: পশ্চিমা গণমাধ্যমের দাবি, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান গোপনে ট্রাম্পকে ইরানে হামলা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন, যদিও প্রকাশ্যে তিনি সৌদির ভূখণ্ড ব্যবহারের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন।
৩. নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি: উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা কাঠামো অনেকাংশেই ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া সৌদির 'ভিশন ২০৩০' বা আমিরাতের বৈশ্বিক ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষায় তারা এই যুদ্ধকে নিজেদের সীমানায় টেনে আনতে চায় না।

৪. আদর্শিক মতবিরোধ: শিয়া-সুন্নি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে। অনেক আরব রাষ্ট্রের কাছে ইরানের এই দুর্বলতা একটি কৌশলগত সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তুরস্কের ভূমিকাও এখানে লক্ষণীয়। ন্যাটো সদস্য এবং ইরানের অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে তারা কোনো পক্ষ না নিয়ে একটি কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আরব দেশগুলো যদি ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের আকাশপথ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিত বা শক্ত কূটনৈতিক অবস্থান নিত, তবে হয়তো ইরান আজ এই চরম ধ্বংসযজ্ঞের মুখে পড়ত না।

Post a Comment

0 Comments