ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের বাধায় বন্ধ থাকা সেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী পরিবার আবার গানের মঞ্চে


ছয় দিন বন্ধ থাকার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পৌর মুক্তমঞ্চে আবার গান গাইতে শুরু করেছেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হেলাল মিয়া ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। গান গেয়ে জীবিকা নির্বাহকারী এই পরিবারটিকে গত মাসে কয়েকজন মাদ্রাসা শিক্ষার্থী গানবাজনা বন্ধ করে ভিক্ষাবৃত্তি করার জন্য হুমকি দিয়েছিল, যার ফলে আতঙ্কে তাঁরা মঞ্চ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।

জানা যায়, গত ২৬ নভেম্বর দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের পৌর মুক্তমঞ্চে গান গাওয়ার সময় কয়েকজন মাদ্রাসা ছাত্র হেলাল মিয়াকে গান বন্ধ করতে বলেন এবং তাঁদেরকে গান না গেয়ে ভিক্ষা করার পরামর্শ দেন। এই হুমকির মুখে রোজগার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন হেলাল ও তাঁর পরিবারের নয় জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সদস্য। এতে তাঁদের জীবন ধারণ কঠিন হয়ে পড়ে।

বহু বছর ধরে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হেলাল মিয়া তাঁর কণ্ঠের মারফতি, মুর্শিদী ও কাওয়ালীর মতো আধ্যাত্মিক গান শুনিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। তাঁর পরিবারে মোট ১৩ জন সদস্যের মধ্যে ৯ জনই জন্ম থেকে অন্ধ এবং তাঁরা সবাই গানের মাধ্যমে সংসার চালান। হেলাল মিয়া জানান, গান গেয়ে প্রতিদিন গড়ে এক থেকে দেড় হাজার টাকা রোজগার হয়, যা দিয়ে তাঁদের ১৩ জনের সংসার চলে।

এই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী পরিবারের গান গাওয়া বন্ধ করে দেওয়ার খবর গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এরপর স্থানীয় প্রশাসনের আশ্বাসে মঙ্গলবার সকালে তাঁরা আবার মুক্তমঞ্চে গান গাওয়া শুরু করেন। তবে পরিবারটি এখনও আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে।

জন্মন্ধ পরিবারের গান গাওয়া বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে স্থানীয় মাদ্রাসা ও হেফাজতে ইসলামের নেতাদের বক্তব্য জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুসিয়া মাদ্রাসার অধ্যাপক এবং জেলা হেফাজতে ইসলামী সভাপতি মুফতি মোবারকুল্লাহ জানান, তাঁর শিক্ষার্থীরা গান গাইতে বাধা দিয়েছেন, এমন তথ্য তাঁর জানা নেই।

অন্যদিকে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানান, হেলাল মিয়া ও তাঁর পরিবার যাতে নির্ভয়ে গান গাইতে পারে, সেজন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, "আমরা প্রশাসন চেষ্টা করব তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য, যাতে তাঁরা সুস্থ ও ভালো থাকেন এবং গানবাজনার মাধ্যমে সুন্দরভাবে জীবন নির্বাহ করতে পারেন।"

তবে, হুমকিদাতাদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ওবায়দুর রহমান বলেন, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী পরিবারকে গান গাইতে বাধা দেওয়ার বিষয়ে তাঁরা কোনো লিখিত অভিযোগ পাননি, তবে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে এবং এ বিষয়ে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নয় জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সদস্যসহ ১৩ জনের এই পরিবারটি আবারও গানের মাধ্যমে তাঁদের জীবিকা নির্বাহের পথ খুঁজে পাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এলেও, হুমকিদাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।

Post a Comment

0 Comments