খামেনির 'আড়াল করা হাত': একটি বিস্ফোরণ ও চার দশকের দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়


ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দীর্ঘ ৩৫ বছরের শাসনকাল এবং তার ব্যক্তিগত জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল তার পক্ষাঘাতগ্রস্ত ডান হাত। দীর্ঘ চার দশক ধরে কালো চাদরের নিচে আড়াল করে রাখা এই হাতটি কেবল একটি শারীরিক সীমাবদ্ধতা ছিল না, বরং এটি ছিল ইরানের ইতিহাসের এক রক্তাক্ত ঘটনার সাক্ষী।

১৯৮১ সালের ২৭ জুন। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আলী খামেনি তেহরানের একটি মসজিদে নামাজ শেষে সমর্থকদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন। সেই সময় এক যুবক একটি টেপ রেকর্ডার টেবিলের ওপর রেখে বোতাম টিপে দেয়। মুহূর্তের মধ্যেই বিকট শব্দে টেপ রেকর্ডারটি বিস্ফোরিত হয়। তদন্তে জানা যায়, এটি ছিল 'ফুরকান গ্রুপ' নামক একটি সশস্ত্র সংগঠনের কাজ। এই ভয়াবহ বিস্ফোরণে খামেনির ডান হাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি তার ফুসফুস ও স্বরযন্ত্রেও জখম হয়।

দীর্ঘ চিকিৎসার পর প্রাণে বেঁচে ফিরলেও তার ডান হাতটি স্থায়ীভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তবে এই শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। তিনি বলেছিলেন, "মস্তিষ্ক আর জিহ্বা ঠিক থাকলেই যথেষ্ট।" পরবর্তীতে তিনি বাঁ হাতে লেখা রপ্ত করেন এবং ১৯৮৯ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

জনসম্মুখে কালো পাগড়ি, গম্ভীর মুখভঙ্গি এবং চাদরের নিচে লুকানো ডান হাত—এই বিশেষ ভঙ্গিটিই হয়ে উঠেছিল তার পরিচিতি বা সিগনেচার স্টাইল। তিনি ছিলেন বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘমেয়াদী শাসক। সম্প্রতি তার প্রয়াণের খবরে ইরানজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার তার দপ্তরে এক হামলায় তিনি নিহত হয়েছেন।

একটি বিস্ফোরণ, একটি অকেজো হাত এবং সেই হাত আড়াল করে রাখার ভঙ্গি—এই সবকিছুর মধ্য দিয়েই রচিত হয়েছে ইরানের আধুনিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ ও বিতর্কিত রাজনৈতিক অধ্যায়। তার অনুপস্থিতিতে ইরানের ক্ষমতার ভারসাম্য কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

Post a Comment

0 Comments