খোঁচ-পাঁচড়া (Scabies) হল এক ধরনের সংক্রামক ত্বকের রোগ, যা একটি ক্ষুদ্র পরজীবী মাইট (Mite) দ্বারা সৃষ্ট। এই মাইটটির বৈজ্ঞানিক নাম হলো Sarcoptes Scabiei। এটি মানুষের ত্বকের উপরে বাস না করে, ত্বকের উপরের স্তরে গর্ত খুঁড়ে ভেতরে ডিম পাড়ে এবং বংশবৃদ্ধি করে।
১. রোগের কারণ ও বিস্তার
- কারণ: Sarcoptes Scabiei নামক মাইট বা ক্ষুদ্র আট-পা বিশিষ্ট পরজীবী।
- সংক্রমণের প্রক্রিয়া: মাইটগুলো ত্বকের উপরের স্তরে (Epidermis) প্রবেশ করে সেখানে সুড়ঙ্গ তৈরি করে এবং ডিম পাড়ে। এই সুড়ঙ্গগুলোতে মাইটের মল, ডিম ও তাদের বর্জ্য পদার্থ জমা হয়, যা তীব্র চুলকানির সৃষ্টি করে।
- বিস্তার: এটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। এটি সাধারণত নিম্নলিখিত উপায়ে ছড়ায়:
- দীর্ঘস্থায়ী ত্বকের যোগাযোগ: আক্রান্ত ব্যক্তির ত্বকের সাথে দীর্ঘ সময় ধরে সরাসরি শারীরিক সংস্পর্শ (যেমন, ঘনিষ্ঠতা, হাত ধরা)।
- কাপড় ও বিছানাপত্র: আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত তোয়ালে, বিছানার চাদর, বা জামাকাপড় ব্যবহার করলে।
- পরিবার ও জনবহুল স্থান: একই পরিবারের সদস্য বা স্কুল, ডে-কেয়ার, নার্সিং হোমের মতো জনবহুল স্থানে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
২. প্রধান লক্ষণ ও উপসর্গসমূহ
খোঁচ-পাঁচড়ার প্রধান এবং সবচেয়ে কষ্টদায়ক লক্ষণ হলো তীব্র চুলকানি, যা সাধারণত রাতে বেড়ে যায়।
- তীব্র চুলকানি: বিশেষ করে রাতে ঘুমোনোর সময় অসহ্য চুলকানি হয়।
- ক্ষুদ্র সুড়ঙ্গ বা বারো (Burrows): ত্বকে ছোট, আঁকাবাঁকা, ধূসর বা ত্বকের রঙের রেখার মতো সুড়ঙ্গ দেখা যেতে পারে, যেখানে মাইটগুলো বাসা বাঁধে।
- ফুসকুড়ি এবং ফোঁড়া: ত্বকে ছোট ছোট লাল ফুসকুড়ি, দানার মতো ক্ষত বা ফোঁড়া দেখা যায়। ক্রমাগত চুলকানোর ফলে চামড়া ছিঁড়ে যেতে পারে এবং সেখানে সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ (Secondary Bacterial Infection) হতে পারে।
মাইটগুলো শরীরের উষ্ণ ও ভাঁজযুক্ত স্থানে থাকতে পছন্দ করে যেমন:
- আঙুলের ফাঁকে
- কব্জি, কনুই
- বগল
- স্তনের চারপাশ (মহিলাদের)
- নিতম্ব বা কোমরের ভাঁজ
- পুরুষদের যৌনাঙ্গ
- শিশুদের ক্ষেত্রে মাথা, ঘাড়, হাতের তালু এবং পায়ের তলায়ও হতে পারে।
৩. রোগ নির্ণয়
সাধারণত ত্বকের লক্ষণ এবং রোগীর ইতিহাস দেখেই চিকিৎসক খোঁচ-পাঁচড়া সন্দেহ করতে পারেন। নিশ্চিত হওয়ার জন্য:
- মাইক্রোস্কোপিক পরীক্ষা: ডাক্তার সন্দেহজনক সুড়ঙ্গ বা ফুসকুড়ি থেকে ত্বকের সামান্য অংশ বা আঁচড়ানো উপাদান সংগ্রহ করে মাইক্রোস্কোপের নিচে পরীক্ষা করেন। মাইট, ডিম বা মাইটের মল পাওয়া গেলে রোগ নিশ্চিত হয়।
৪. চিকিৎসা পদ্ধতি
খোঁচ-পাঁচড়া নিজে থেকে সেরে যায় না; এর জন্য চিকিৎসা প্রয়োজন। চিকিৎসার প্রধান লক্ষ্য হল মাইট এবং তাদের ডিম ধ্বংস করা।
টপিকাল মাইটিসাইড (Topical Mite Killer):
- পারমেথ্রিন ক্রিম (Permethrin Cream): এটি সবচেয়ে সাধারণ এবং কার্যকর চিকিৎসা। সাধারণত গলা থেকে পা পর্যন্ত পুরো শরীরে লাগিয়ে ৮ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর ধুয়ে ফেলতে হয়। এক সপ্তাহ পর চিকিৎসার পুনরাবৃত্তি করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
- ক্রোটামিটন (Crotamiton) বা সালফার মলম (Sulfur Ointment): পারমেথ্রিনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
ওরাল মেডিকেশন (Oral Medication):
- আইভারমেকটিন (Ivermectin): গুরুতর বা ব্যাপক সংক্রমণের ক্ষেত্রে (যেমন ক্রাস্টেড স্ক্যাবিস) অথবা যখন টপিকাল চিকিৎসা কাজ করে না, তখন এই ওষুধ সেবন করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
চুলকানি ও প্রদাহ কমানো:
- চুলকানি কমানোর জন্য অ্যান্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধ সেবন করা যেতে পারে।
- প্রদাহ এবং অ্যালার্জিজনিত প্রতিক্রিয়া কমানোর জন্য স্টেরয়েড মলম ব্যবহার করা যেতে পারে (চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী)।
৫. প্রতিরোধ ও সতর্কতা
খোঁচ-পাঁচড়া সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলি গ্রহণ করা উচিত:
- একসাথে চিকিৎসা: আক্রান্ত ব্যক্তির পাশাপাশি তার পরিবারের সকল সদস্য এবং ঘনিষ্ঠ যোগাযোগে আসা ব্যক্তিদের (যৌন সঙ্গীসহ) লক্ষণ না থাকলেও একই সময়ে চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা:
- আক্রান্ত ব্যক্তি কর্তৃক ব্যবহৃত সমস্ত পোশাক, তোয়ালে এবং বিছানাপত্র গরম জল দিয়ে ধুয়ে উচ্চ তাপে শুকিয়ে নিতে হবে।
- ধোয়া সম্ভব না হলে, বস্তুগুলি একটি সিল করা প্লাস্টিকের ব্যাগে অন্তত ৭২ ঘণ্টা থেকে এক সপ্তাহ পর্যন্ত ভরে রাখতে হবে। মাইটগুলো পোষকের শরীর ছাড়া সাধারণত ২-৩ দিনের বেশি বাঁচতে পারে না।
- যোগাযোগ এড়িয়ে চলা: চিকিৎসা চলাকালীন এবং পুরোপুরি সেরে না ওঠা পর্যন্ত আক্রান্ত ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ শারীরিক যোগাযোগ এড়িয়ে চলতে হবে।
খোঁচ-পাঁচড়া থেকে মুক্তি পেতে দ্রুত এবং সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করা অপরিহার্য। আপনি বা আপনার পরিবারের কেউ আক্রান্ত হলে একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
0 Comments