যুদ্ধ বাধিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অপচেষ্টা করলেও এখন নিজের তৈরি করা যুদ্ধের আগুনে পুড়ছেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সমঝোতা চুক্তি ইসরাইলের রাজনীতিতে বড় ধরনের ভূমিকম্প সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের এই সিদ্ধান্ত ইসরাইলের জন্য একটি বড় কৌশলগত ধাক্কা এবং তেহরানের জন্য এক বিশাল কূটনৈতিক জয়। একদিকে হোয়াইট হাউসের আস্থাহীনতা, অন্যদিকে নিজ দেশে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক খেলোয়াড়ের ক্ষমতা এখন শেষের অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ তিন মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর পাকিস্তান সরকারের মধ্যস্থতায় আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে এই সমঝোতা চুক্তি হতে যাচ্ছে। এই চুক্তি কেবল চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটাচ্ছে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার উন্মোচন করেছে। হামাস, হিজবুল্লাহ এবং ইরানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় লাভ করে দেশের অভ্যন্তরে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করার যে পরিকল্পনা নেতানিয়াহু করেছিলেন, তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন যে, ওয়াশিংটনে ইসরাইলের আগের সেই একচ্ছত্র প্রভাব আর নেই। ইসরাইলের তীব্র আপত্তিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কূটনৈতিক সমাধানের পথ বেছে নিয়েছেন। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সংক্রান্ত ইস্যুতে মার্কিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ইসরাইলের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ার বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।
আন্তর্জাতিক এই ধাক্কার পাশাপাশি ইসরাইলের অভ্যন্তরেও নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেছেন যে, নেতানিয়াহু নিজের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থে এই সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করতে চান। তিনি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, ক্ষমতা ধরে রাখতে নেতানিয়াহু আসন্ন সাধারণ নির্বাচনও বাঞ্চাল করার চেষ্টা করতে পারেন। যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে জনগণকে লাঠি ও পাথর নিয়ে রাস্তায় নেমে এসে প্রতিরোধের মাধ্যমে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে তাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন এহুদ বারাক।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই সমঝোতা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে যুদ্ধ-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যে তেহরান আরও শক্তিশালী অবস্থানে ফিরে আসবে। এর ফলে ইসরাইলকে ভবিষ্যতে গাজা, লেবানন কিংবা অন্যান্য আঞ্চলিক ইস্যুতে ওয়াশিংটনের দেওয়া কঠিন শর্তসমূহ মেনে চলতে বাধ্য হতে হবে। ফলশ্রুতিতে, এই চুক্তি কেবল যুদ্ধের সমাপ্তির কোনো সাধারণ দলিল নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
0 Comments