ইরান ইস্যুতে কৌশলগত চাপে ট্রাম্প: সুর নরম করে শান্তি চুক্তির খোঁজে ওয়াশিংটন

ইরানকে কঠোর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপে ফেলার কৌশল নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই এখন উল্টো কৌশলগত গেরাকলে পড়েছেন। মাত্র সপ্তাহখানেক আগেও ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা মার্কিন প্রেসিডেন্ট এখন শান্তি চুক্তির জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। ইরান সংকট বর্তমানে হোয়াইট হাউসকে পুরোপুরি আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে।

কূটনৈতিক অঙ্গনে ট্রাম্পের আকস্মিক অবস্থান পরিবর্তন নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রথমে তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে খুব দ্রুতই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হতে যাচ্ছে। তবে মাত্র একদিনের ব্যবধানে সুর নরম করে ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছাতে উভয় পক্ষকেই আরও সময় নিতে হবে। ওয়াশিংটনের এই অবস্থান পরিবর্তন ইঙ্গিত করে যে, ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগের মার্কিন নীতি প্রত্যাশিত ফল আনতে ব্যর্থ হয়েছে


বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হিসেবে পরিচিত 'হরমুজ প্রণালী', যেখান দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন করা হয়। এই প্রণালীকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া তীব্র সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা মার্কিন প্রশাসন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ ইস্যুতে কাঙ্ক্ষিত সুবিধা না পেয়েই এখন বাধ্য হয়ে শান্তি আলোচনার পথ বেছে নিয়েছে ওয়াশিংটন

আমেরিকার চাপের মুখে ইরানও অত্যন্ত কৌশলী অবস্থান বজায় রেখেছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, তাদের দেশ কোনো পারমাণবিক বোমা তৈরি করবে না, তবে নিজেদের বৈধ অধিকার থেকেও তারা একচুল সরবে না। মূল জটিলতা তৈরি হয়েছে দুই পক্ষের শর্ত নিয়ে—যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর কঠোর আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে ইরান দাবি করছে তাদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকে জব্দ থাকা অর্থ ফেরত দেওয়া

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, চলমান আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হলেও দুই দেশ চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে—এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। তিনি আরও উল্লেখ করেন, যদি কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়ও, তবুও পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে পারমাণবিক ইস্যুসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুই পক্ষকে আবারও আলোচনায় বসতে হবে

চলমান এই শান্তি আলোচনাকে নস্যাৎ করতে ইসরাইল চেষ্টা চালাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে তেহরান। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক ফোনালাপের পর ইরানের এই সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান বিস্ফোরক বাস্তবতায় ইসরাইল-ইরান দ্বন্দ্ব এই চুক্তি প্রক্রিয়ায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে

যে ডোনাল্ড ট্রাম্প একসময় শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে ইরানকে কোণঠাসা করতে চেয়েছিলেন, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তাকেই এখন পিছু হটে শান্তি চুক্তির রাস্তা খুঁজতে হচ্ছে। এটি ট্রাম্পের কূটনৈতিক সফলতা নাকি ইরানের কৌশলী অবস্থানের সামনে আমেরিকার পিছু হটা, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে টানটান উত্তেজনা

Post a Comment

0 Comments