২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ফুটবল বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি জার্মানিকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে এক অবিশ্বাস্য রূপকথা তৈরি করেছে ইকুয়েডর। ম্যাচের দ্বিতীয় মিনিটেই পিছিয়ে পড়েও যেভাবে 'লা ট্রি'-রা ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তা বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম সেরা অঘটন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই জয়ের মাধ্যমে গ্রুপ 'ই' থেকে ৩য় স্থানে শেষ করলেও সেরা আটটি ৩য় স্থান অধিকারী দলের অন্যতম হিসেবে রাউন্ড অব ৩২ নিশ্চিত করেছে ইকুয়েডর।
ম্যাচের বিবরণী ও মূল মুহূর্ত
- ভেন্যু: নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়াম (মেটলাইফ স্টেডিয়াম)
- দর্শক উপস্থিতি: ৫৫,০০০ (অধিকাংশই ইকুয়েডরের সমর্থক)
- ম্যাচের ফলাফল: ইকুয়েডর ২ - ১ জার্মানি
- গোলদাতা: লেরয় সানে (২' - জার্মানি), নিলসন অ্যাঙ্গুলো (৯' - ইকুয়েডর), গঞ্জালো প্লাটা (৭৮' - ইকুয়েডর)
ম্যাচ শুরুর বাঁশি বাজার সাথে সাথেই আক্রমণাত্মক রূপ নেয় জার্মানি। ম্যাচের ১ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডে ফ্লোরিয়ান উইর্টজের পাস থেকে ডি-বক্সের ভেতর দারুণ ফিনিশিংয়ে জার্মানিকে এগিয়ে নেন লেরয় সানে। এটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে জার্মানির দ্বিতীয় দ্রুততম গোল। তবে এই গোলের বিল্ড-আপে জার্মানির আলেকজান্ডার পাভলোভিচের হাই-বুট ফাউল ছিল দাবি করে তীব্র প্রতিবাদ জানায় ইকুয়েডরের খেলোয়াড়রা।
প্রাথমিক ধাক্কা সামলে দ্রুতই খেলায় ফেরে ইকুয়েডর। ম্যাচের ৯ মিনিটে জার্মানির মিডফিল্ডার ফেলিক্স নমেচা নিজেদের অর্ধে বল হারালে তা কেড়ে নেন সান্ডারল্যান্ডের উইঙ্গার নিলসন অ্যাঙ্গুলো। প্রায় ২০ গজ দূর থেকে নেওয়া তার দুর্দান্ত ও নিখুঁত দূরপাল্লার শট কিংবদন্তি গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়ারকে পরাস্ত করে জালে জড়ায় (১-১)। এরপর প্রথমার্ধে তীব্র গতি ও শারীরিক ফুটবল উপহার দেয় দুই দলই, তবে স্কোরলাইনে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই (৪৭ মিনিটে) কাই হাভার্টজ বক্সের ভেতর ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টির বাঁশি বাজিয়েছিলেন রেফারি। তবে ভিএআর (VAR) রিভিউতে দেখা যায় সানে আগেই ফাউল করেছিলেন, যার ফলে পেনাল্টি বাতিল হয়। ৬০ মিনিটের দিকে জার্মানি তাদের 'সুপার-সাব' দেনিজ উন্দাভ এবং মালিক থিয়াওকে মাঠে নামায়।
ম্যাচের ৭২ মিনিটে ম্যানুয়েল নয়ার এবং জোনাথন টাহ-এর মধ্যকার ভুল বোঝাবুঝির কারণে গোল প্রায় পেয়েই যাচ্ছিল ইকুয়েডর, কিন্তু সে যাত্রায় গঞ্জালো প্লাটা বল বারের ওপর দিয়ে ভাসিয়ে দেন। তবে নিজের সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে প্লাটা সময় নেননি মাত্র ৬ মিনিট।
একটি কর্নার কিক থেকে البدিল (substitute) কেভিন রদ্রিগেজ হেডের মাধ্যমে বল বক্সের ভেতর বাড়িয়ে দেন। রক্ষণভাগকে ফাঁকি দিয়ে তীব্র গতিতে ছুটে এসে ম্যানুয়েল নয়ারের গ্লাভস ছোঁয়ার ভগ্নাংশ সময় আগে বুট ছুঁইয়ে বল জালে জড়ান গঞ্জালো প্লাটা। মেটলাইফ স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে উপস্থিত ৫৫,০০০ দর্শক বন্য উল্লাসে ফেটে পড়েন। ম্যাচের শেষ ১০ মিনিটে জার্মানি সমতায় ফিরতে মরিয়া হয়ে অল-আউট আক্রমণ চালালেও ইকুয়েডরের ইস্পাতকঠিন রক্ষণভাগ ভেদ করতে পারেনি।
পরিসংখ্যান ও রেকর্ডের খেরোখাতা
- ২০০৬ সালের পর এই নিয়ে মাত্র দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করলো ইকুয়েডর।
- বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে এই প্রথম কোনো দক্ষিণ আমেরিকান দলের কাছে হারলো জার্মানি। এর আগের ১০ ম্যাচে তারা অপরাজিত ছিল (৭ জয়, ৩ ড্র)।
- ২০১৩ সালে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালকে হারানোর দীর্ঘ ১৩ বছর পর এই প্রথম কোনো উয়েফা (UEFA) ভুক্ত দেশের বিপক্ষে জয় পেল ইকুয়েডর।
- এই ম্যাচে মাঠে নেমে জার্মানির জার্সিতে লোথার ম্যাথিউস ও মিরোস্লাভ ক্লোসার সর্বোচ্চ ২২টি বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলার রেকর্ড স্পর্শ করলেন ম্যানুয়েল নয়ার।
জার্মানি এই ম্যাচে হারলেও ৬ পয়েন্ট নিয়ে গোল ব্যবধানে এগিয়ে থেকে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবেই রাউন্ড অব ৩২-এ পা রাখছে। তবে ম্যাচ শেষে জার্মান অধিনায়ক জশুয়া কিমিচ দলের খেলাকে "অগোছালো ও ছন্নছাড়া" বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে, এই মহাকাব্যিক জয় ইকুয়েডরকে নকআউট পর্বের আগে এক বিশাল আত্মবিশ্বাস এনে দিল।
0 Comments